🏛Ramayana·children

যে রাজা সারা জীবন দিয়ে এমন মানুষদের জন্য নদী নামিয়ে আনলেন, যাঁদের সঙ্গে তাঁর কখনও দেখাই হয়নি

ষাট হাজার রাজপুত্র চুরি যাওয়া একটা ঘোড়া খুঁজতে গিয়ে মাটি খুঁড়ল, ভুল লোককে চোর বলল, আর ফিরে এল এক গাদা ছাই হয়ে। তাদের মুক্তি দিতে পারত কেবল এক নদীর জল, আর সেই নদী তখনও আকাশে। তিন রাজা চেষ্টা করে হেরে গেলেন। চার নম্বর জন দাঁড়িয়ে রইলেন, নড়লেন না।

VEVidhata Editorial Desk· Mahabharata, Ramayana, Puranas, Jataka tales, regional folklore
·4 min read·Source: Valmiki Ramayana, Bala Kanda, sargas 38-44

পর্যালোচক Vidhata Editorial Desk · আপডেট

In this story
  1. ঘোড়া হারিয়ে গেল
  2. ষাট হাজার ভাই মাটি খোঁড়ে
  3. পাখির উত্তর
  4. ভগীরথ দাঁড়িয়ে থাকেন
  5. জল ছাইয়ের কাছে পৌঁছল

ঘোড়া হারিয়ে গেল

রাম জন্মাবার অনেক আগে অযোধ্যায় রাজত্ব করতেন তাঁরই এক পূর্বপুরুষ। তাঁর নাম সগর। তিনি ঠিক করলেন, অশ্বমেধ যজ্ঞ করবেন।

নিয়মটা ছিল এই রকম। একটা ঘোড়াকে এক বছর ধরে ছেড়ে দেওয়া হয়, সে যেদিকে খুশি যাক। ঘোড়া যেখানে যায়, সেই জমি রাজার হয়ে যায়, যদি কেউ ঘোড়াটাকে না আটকায়। সগরের ছিল ষাট হাজার ছেলে, আর এক নাতি, অংশুমান। ঘোড়ার পিছনে পিছনে হাঁটার কাজ পেলেন অংশুমান।

তাতেও ঘোড়া চুরি হয়ে গেল। ছদ্মবেশে এক রাক্ষস ঘোড়াটা নিয়ে উধাও হল।

যাও, খুঁজে আনো, সগর তাঁর ষাট হাজার ছেলেকে বললেন। সারা পৃথিবী খোঁজো। দরকার হলে মাটি খুঁড়ে ফেলো।

ষাট হাজার ভাই মাটি খোঁড়ে

তারা নখ দিয়ে খুঁড়ল। তাদের নখ ছিল হীরের মতো শক্ত। খোঁড়ার শব্দ হচ্ছিল বাজ পড়ার মতো।

সারা পৃথিবী ঘুরেও কিছু পেল না। বাবা আবার তাদের পাঠালেন। এবার তারা নিচের দিকে খুঁড়তে লাগল। মাটির অনেক নিচে দেখা হল সেই বিশাল হাতিদের সঙ্গে, যারা পৃথিবীর দিকগুলো ধরে রাখে। ভাইয়েরা এক এক করে সবাইকে প্রণাম করল, তারপর আবার খুঁড়তে লাগল।

তারপর ঘোড়াটা পাওয়া গেল। চুপচাপ ঘাস খাচ্ছে। পাশে বসে আছেন এক মুনি, চোখ বোজা। সেই মুনি কপিল।

ভাইয়েরা একবারও জিজ্ঞেস করল না। হাতের কাছে যা পেল তুলে নিল, আর চিৎকার করতে করতে তেড়ে গেল, চোর, তোকে পেয়েছি।

কপিল চোখ খুললেন। একটা অক্ষর বললেন। ষাট হাজার ভাই ছাই হয়ে গেল।

পাখির উত্তর

ছেলেরা ঘরে ফিরল না। সগর তখন নাতিকে পাঠালেন।

অংশুমান সেই একই পথে নিচে নামলেন। শেষে এক জায়গায় পৌঁছে দেখলেন, মাটিতে ছাইয়ের পাহাড় পড়ে আছে। আর তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে ঘোড়াটা, বেঁচে আছে, ভালোই আছে।

তিনি কাকাদের জন্য জল দিতে চাইলেন, মৃতের জন্য যেমন দিতে হয়। চারদিকে খুঁজলেন, কোথাও এক ফোঁটা জল নেই। তখন তাঁর পাশে নেমে এল এক প্রকাণ্ড পাখি। সে গরুড়, অংশুমানের মায়ের ভাই।

গরুড় বলল, এদের সাধারণ জল দিয়ো না, তাতে কাজ হবে না। এদের মুক্তি হবে কেবল গঙ্গার জলে। আর গঙ্গা পৃথিবীতে নেই। তিনি আকাশে। তাঁকে এখানে নামিয়ে আনো। এই ছাইয়ের উপর দিয়ে তাঁকে বইতে দাও। তোমার কাকারা সোজা স্বর্গে চলে যাবেন।

সগর যজ্ঞ শেষ করলেন। তারপর সারা জীবন ভাবলেন, আকাশ থেকে নদী নামানো যায় কী করে। পারলেন না। তিনি মারা গেলেন।

অংশুমান রাজা হলেন। বুড়ো বয়সে তিনি হিমালয়ের এক চূড়ায় উঠলেন, আর ওখানে দাঁড়িয়ে বত্রিশ হাজার বছর প্রার্থনা করলেন। নদী এল না। ওখানেই তাঁর মৃত্যু হল। তাঁর ছেলে দিলীপ সারা রাজত্বকাল রোজ এই কথা ভাবলেন। তিনিও পথ পেলেন না।

তিন রাজা, একের পরে এক। ছাই যেখানে পড়ে ছিল, সেখানেই পড়ে রইল।

ভগীরথ দাঁড়িয়ে থাকেন

দিলীপের ছেলে ভগীরথ।

তিনি রাজ্যের ভার মন্ত্রীদের হাতে দিয়ে চলে গেলেন গোকর্ণ নামে এক জায়গায়। গরমের দিনে সেখানে দাঁড়ালেন। চারপাশে চারটে আগুন জ্বলছে, মাথার উপরে সূর্য, সেটাই পাঁচ নম্বর আগুন। দুই হাত উপরে তোলা। খাওয়া মাসে একবার। এইভাবে এক হাজার বছর।

ব্রহ্মা এসে বললেন, কিছু চাও।

ভগীরথ দুটো জিনিস চাইলেন। সগরের ছেলেদের জন্য নদীটাকে নামাতে দিন। আর আমাকে একটা সন্তান দিন, যাতে আমাদের বংশ আমার সঙ্গেই শেষ না হয়ে যায়।

ব্রহ্মা রাজি হলেন। সঙ্গে সাবধানও করে দিলেন। গঙ্গা বিশাল। তিনি সোজা পৃথিবীর উপর পড়লে পৃথিবী সেই ধাক্কা সহ্য করতে পারবে না। ওই পড়া ধরতে পারেন কেবল শিব।

তাই ভগীরথ এক পায়ের বুড়ো আঙুলের ডগায় দাঁড়িয়ে রইলেন, পুরো এক বছর। হাত উপরে তোলা। খাওয়া শুধু হাওয়া। খুঁটির মতো স্থির। শেষে শিব এসে বললেন, তোমার উপর আমি খুশি। আমি ওঁকে মাথায় নেব।

গঙ্গা তাঁর সমস্ত ভার নিয়ে আকাশ থেকে নেমে এলেন। মনে মনে ঠিক করে এসেছিলেন, এই শিবকে ধাক্কা দিয়ে পৃথিবীর এ পাশ থেকে ও পাশে পাঠিয়ে দেবেন। শিব ঠিক জানতেন তিনি কী ভাবছেন। তিনি গঙ্গাকে নিজের জটার উপর পড়তে দিলেন, আর জটা গঙ্গাকে ভিতরে আটকে ফেলল।

বছরের পর বছর গঙ্গা সেই জটার ভিতরে ঘুরে বেড়ালেন। বেরোবার পথ পেলেন না।

নিচে পৃথিবীতে ভগীরথ অপেক্ষা করলেন। কোনও নদী দেখলেন না। তিনি আবার প্রথম থেকে তপস্যা শুরু করলেন।

জল ছাইয়ের কাছে পৌঁছল

শেষে শিব তাঁকে ছাড়লেন, বিন্দুসর নামে এক সরোবরে। সেখান থেকে গঙ্গা সাতটা ধারায় বেরিয়ে এলেন। তার মধ্যে সাত নম্বর ধারাটা ভগীরথের রথের পিছনে পিছনে চলল।

তিনি রথ চালালেন, নদী তাঁর পিছনে এল। একবার জহ্নু নামে এক মুনির যজ্ঞ চলছিল, গঙ্গা সব ভাসিয়ে দিলেন। জহ্নু এক চুমুকে গোটা নদীটা খেয়ে ফেললেন। সবাই তাঁকে অনেক অনুরোধ করল। তখন তিনি দুই কান দিয়ে গঙ্গাকে ছেড়ে দিলেন। সেই থেকে তাঁর এক নাম জাহ্নবী, মানে জহ্নুর মেয়ে। তারপর গঙ্গা আবার রথের পিছনে এসে চললেন, যেন কিছুই হয়নি।

ভগীরথ রথ চালিয়ে সমুদ্র পর্যন্ত গেলেন, তারপর সমুদ্রের নিচের সেই জায়গায় নামলেন। জল ছাইয়ের উপর দিয়ে বয়ে গেল।

ব্রহ্মা এসে বললেন, কাজ শেষ। ষাট হাজার মুক্তি পেল। এই পৃথিবীতে যতদিন সমুদ্র থাকবে, ততদিন তারা স্বর্গে থাকবে। আর আজ থেকে এই নদী তোমার মেয়ে। লোকে তোমার নামেই ওঁকে ভাগীরথী বলে ডাকবে।

তারপর ব্রহ্মা খুব সাধারণ একটা কথা বললেন, আর আসল কথা তো সেটাই। এখন স্নান করো। পিতৃপুরুষদের জন্য ঠিকমতো তর্পণ করো। তারপর ঘরে ফিরে রাজত্ব করো।

সগর পারেননি। অংশুমান পারেননি। দিলীপ পারেননি। ভগীরথ পারলেন। আর যাঁদের জন্য পারলেন, তাঁদের একজনের সঙ্গেও তাঁর কখনও দেখা হয়নি।

ব্রহ্মা শেষে যে কাজটা করতে বললেন, সেটা খুব সাধারণ কাজ। পিতৃপক্ষের সেই পনেরো দিনে ঘরে ঘরে আজও সেই কাজটাই হয়। নিজের বংশের মৃতদের নাম করে করে জল দেওয়া।

এই বছর আপনার পরিবারের শ্রাদ্ধ কোন তিথিতে পড়ছে, তা যদি ঠিক জানা না থাকে, তাহলে [একজন আচার্যকে জিজ্ঞাসা করুন](/app/ask)।

উৎস

#bhagiratha#ganga#sagara#kapila#pitru paksha#shraddha#children

If you liked this story

Browse all →

More rare tales